![]() |
| প্রতীকি ছবি। ফটো ক্রেডিট: Pixabay |
রাজধানী থেকে ফিরতে গিয়ে কিংবা প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর আকুলতায় এবারের ঈদুল ফিতরের যাত্রা শেষ হয়েছে রক্তপাত ও শোকের ছায়ায়। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, মাত্র ১০ দিনে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৭৪ জন।
গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে
বেড়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ২৭৪ জনের মৃত্যু ছাড়াও আহত হয়েছেন আরও অনেকে। গত বছর ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ১১ দিনে নিহতের সংখ্যা ছিল ২৪৯ জন।
কুমিল্লার ট্রেন-বাস সংঘর্ষ, রাজবাড়ীতে ফেরিঘাটে বাসডুবি:
আলোড়ন সৃষ্টিকারী দুর্ঘটনা
এবারের ঈদযাত্রায় শুধু সংখ্যাই নয়, কিছু দুর্ঘটনার ভয়াবহতা সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ২১ মার্চ রাতে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলায় একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ১২ জনের। নিহতদের মধ্যে ছিলেন শিশু ও নারী।
এর মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাটে পদ্মা নদীতে একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডুবে যায়। সেই দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ২৬ জনের। উদ্ধার অভিযান চালিয়ে বেশির ভাগ মরদেহ উদ্ধার করা গেলেও নিখোঁজ থাকা বেশ কয়েকজনের সন্ধান দীর্ঘ সময় পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ফেরি ঘাটে নামার সময় যানজট ও চালকের নিয়ন্ত্রণহীনতাই এই দুর্ঘটনার মূল কারণ।
বিআরটিএ’র তথ্যও উদ্বেগজনক
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের
(বিআরটিএ) হিসাবেও প্রাণহানির সংখ্যা কম নয়। বিআরটিএ সূত্র জানায়, ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৭ দিনে ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন। ঈদের আগে ও পরে মিলিয়ে দুর্ঘটনার এই প্রবণতা আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চালকের বেপরোয়া
গতি, ফিটনেসহীন
গাড়ি: দুর্ঘটনার
মূল কারণ
পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু চালকদের বেপরোয়া গতির কারণেই মোট দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশ ঘটে। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের দৌরাত্ম্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ঈদের আগে যাত্রীচাপ বাড়লেও মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি যথেষ্ট ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন অনেক যাত্রী।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, শুধু ঈদ নয়, বছরের অন্য সময়েও একই চিত্র দেখা যায়। কিন্তু ছুটির মৌসুমে প্রশাসনের তৎপরতা তুলনামূলক কমে যায়, যার ফলে দুর্ঘটনা বেড়ে যায়।
রোড সেফটি
ফাউন্ডেশনের নির্বাহী
পরিচালক: ‘সড়ক
ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই
বড় বাধা’
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের
নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনায়
প্রকৃত দুর্বলতা রয়েছে। শুধু ঈদের আগে সতর্কতা জারি করলে হবে না; সারাবছরই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি বছর দুর্ঘটনার সংখ্যা কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নানা প্রতিশ্রুতি
দেয়, কিন্তু বাস্তবায়নে দেখা যায় ভাটা পড়ে। ফিটনেসবিহীন
যান চলাচল বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।’
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
সড়ক প্রকৌশলী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে, চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং মহাসড়কে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে ড্রাইভারদের
বিশ্রামের ব্যবস্থা, ওভারটেকিং নিয়ন্ত্রণ, এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের
(বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট
রিসার্চ ইনস্টিটিউটের
এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনাই ঘটে চালকের মনোসংযোগের অভাব, অতিরিক্ত গতি এবং যানবাহনের ফিটনেস না থাকার কারণে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসন যদি এ তিনটি বিষয়ে কঠোর হয়, তাহলে প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
যাত্রীদের প্রত্যাশা
ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার খবরে, স্বজন হারানো অনেক পরিবার এখন শোকাহত। রাজধানীর কল্যাণপুর এলাকার বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বাসে করে ফরিদপুর যাচ্ছিলাম। পথে কয়েক জায়গায় রাস্তার পাশে দুর্ঘটনার দেখা পেয়েছি। পুলিশ ছিল, কিন্তু অনেক জায়গায় গতির নিয়ন্ত্রণ ছিল না। প্রশাসনের আরও মনিটরিং দরকার।’
সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক নেতারা দাবি করেন, যাত্রীচাপ সামাল দিতে অনেক সময় অনুমোদনের চেয়ে বেশি গাড়ি নামানো হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। তারা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এ সমস্যা নিরসনে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন।
উপসংহার: পরিবর্তন
আনা কি সম্ভব?
প্রতিবার ঈদের পরই দুর্ঘটনার এই করুণ পরিসংখ্যান সামনে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি
পরিকল্পনা ও কঠোর প্রয়োগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। জনসচেতনতা, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা ও সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন—এই তিন স্তরে কাজ করেই মৃত্যুর এই সংখ্যা কমিয়ে আনা যায়।
তবে যতক্ষণ না পর্যন্ত ফিটনেসবিহীন যান, লাইসেন্সবিহীন চালক ও বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ ঈদযাত্রা বা যেকোনো সময় সড়কে নামা হবে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশাসন ও জনগণ—সবার সম্মিলিত প্রয়াসই পারে শোকের এই রেকর্ড ঘুচাতে।
